শনিবার, জুন ১৫, ২০২৪

১ আষাঢ় ১৪৩১

শনিবার, জুন ১৫, ২০২৪
১ আষাঢ় ১৪৩১
সরকারি রেজিস্ট্রেশন নম্বর- ১৮২
আপনি পড়ছেন : জাতীয়

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় ফেরিডুবি

ফেরিডুবি ঘটনায় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীর ভিন্ন বয়ান


ডেস্ক রিপোর্ট:
2024-01-17 21:11:15
ফেরিডুবি ঘটনায় প্রশাসন ও  প্রত্যক্ষদর্শীর ভিন্ন বয়ান

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটের কাছে ‘রজনীগন্ধা’ ফেরিডুবির কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও প্রত‌্যক্ষদর্শীরা।  এ ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিসির পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ফেরিডুবির কারণ হিসেবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলেছেন, বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ডুবে গেছে ফেরিটি। তবে নৌ পুলিশ জানিয়েছে, নদীর ডুবোচরে ধাক্কা খেয়ে ফেরির তলা ফেটে ডুবে গেছে এটি। তবে ফেরিতে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী ও ট্রাকচালকরা জানিয়েছেন, ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকে কাত হয়ে ধীরে ধীরে ডুবে যায় ফেরিটি। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) সকাল সোয়া ৮টার দিকে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটের অদূরে নোঙর করে রাখা যানবাহনবোঝাই ফেরিটি ডুবে যায়।

   স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসে রজনীগন্ধা। এতে ছোট-বড় ৯টি ট্রাক ছিল। ঘন কুয়াশার কারণে রাত দেড়টার দিকে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে ফেরিটি আটকে যায়। এ সময় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। বুধবার সকাল ৮টার পরপরই ডুবতে থাকে ফেরিটি। তখন যানবাহনের চালক, সহকারী ও ফেরিতে কর্মরত লোকজন দ্রুত নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচান।

   ফেরিডুবির কারণ হিসেবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) শাহ মোহাম্মদ খালেদ নেওয়াজ বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে ফেরিটি সাতটি ছোট ট্রাক ও দুটি বড় ট্রাক নিয়ে দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাটুরিয়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। কিন্তু ঘন কুয়াশার কারণে পাটুরিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাটের অদূরে নোঙর করে রাখে। সকাল ৮টার দিকে বালুবাহী একটি বাল্কহেড ফেরিটিকে ধাক্কা দিলে এক পাশ কাত হয়ে নদীতে ডুবে যায়। ঘন কুয়াশার কারণে বাল্কহেডটি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ৮টা থেকে সোয়া ৮টার মধ্যে ফেরিটি ডুবে গেছে।’

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের লোকজন ট্রলার নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। এর আগে নদীতে ঝাঁপ দেওয়া কয়েকজন সাঁতরে নদীর তীরে ওঠেন। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ছয় জনকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। এ ঘটনায় ফেরির দ্বিতীয় ইঞ্জিনচালক হুমায়ুন কবির (৩৯) নিখোঁজ রয়েছেন।

দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে নৌ পুলিশের ফরিদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়া ঘাটের আসার পথে ডুবোচরে ধাক্কা লেগে ফেরির তলা ফুটো হয়ে গেলে পানি ঢুকতে থাকে। কুয়াশায় পথ দেখতে না পেয়ে পাটুরিয়া ঘাটের ২০০-২৫০ গজ অদূরে ফেরিটি নোঙর করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে পানি ঢুকে সকাল সোয়া ৮টার দিকে ৯টি ট্রাকসহ ফেরিটি নদীতে ডুবে যায়। ফেরিতে থাকা ২০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই পণ্যবাহী ট্রাকের চালক-শ্রমিক। তবে ফেরির ইঞ্জিনচালক হুমায়ুন কবির নিখোঁজ রয়েছেন। তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস।’ 

ডুবে যাওয়া ফেরি থেকে বেঁচে ফেরাদের মধ্যে আট জন ট্রাকচালক রয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচ জন চালক জানিয়েছেন, কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে নয়, ফেরির তলা ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকে ডুবে গেছে।

ফেরিসহ ডুবে যাওয়া একটি ট্রাকের চালক আশিক শেখ। তিনি বলেন, ‘কুয়াশার কারণে ফেরিটি আটকা পড়ে এবং আমরা অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ ফেরির এক কর্মচারী চিৎকার করে বলেন যে, ফেরিতে পানি ঢুকছে। তিনি আমাদের নদীতে ঝাঁপ দিতে বলেন। তারা আমাদের কোনও লাইফ জ্যাকেট বা কিছুই দেয়নি। এ অবস্থায় আমি নদীতে ঝাঁপ দেই এবং সাঁতরে জীবন বাঁচাই। তুলাবোঝাই আমার ট্রাকটি ডুবে গেছে।’ 

ফেরিতে থাকা আরেক ট্রাকের চালক সাজ্জাদ আলী বলেন, ‘রাত দেড়টার দিকে ফেরিটি আটকা পড়ে এবং কেউ কেউ বলেছিল, ডুবোচরে আটকে গেছে। পরে জানতে পারি, কুয়াশার কারণে ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমরা ফেরিতেই ছিলাম। পরে ফেরির এক কর্মী আমাদের জানান, এটি ডুবে যাচ্ছে। তখন দেখি, ধীরে ধীরে পানি ওঠে এবং এক পর্যায়ে ডুবে যায়। কোনও কিছুর সঙ্গে ফেরির সংঘর্ষ হয়নি। পানি ঢুকে ডুবেছে।’

ফেরিতে থাকা চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা পণ্যবোঝাই ট্রাকের মালিক নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৬টার পর নোঙর করা ফেরির পেছন দিক দিয়ে পানি উঠতে থাকলে আমরা ফেরির লোকজনকে ডেকে বিষয়টি দেখাই। তারা তোয়াক্কা করেনি। ইচ্ছা করলে ফেরিটি দ্রুত চালু করে তীরে যেতে পারতো। ফেরিকে বাল্কহেড কিংবা কোনও নৌযান ধাক্কা দেয়নি, তলা ফেটে এটি ডুবে গেছে। আমরা নিজ চোখে দেখেছি।’

ফেরিতে থাকা আরেক ট্রাকচালক মজনু মিয়া বলেন, ‘ভোরের দিকে তলা ফেটে ফেরিতে পানি উঠতে থাকে। ফেরির লোকজনকে জানালে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা চালায়। ধীরে ধীরে এক পাশ কাত হয়ে ডুবতে থাকে। একপর্যায়ে সকাল সোয়া ৮টার দিকে ডুবে যায়। এ সময় আমরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জীবন বাঁচাই।’

ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যের কারণ জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক শাহ মোহাম্মদ খালেদ নেওয়াজ বলেন, ‘আমরা প্রাথমিকভাবে শুনেছি, বাল্কহেডের ধাক্কায় ফেরিটি ডুবে গেছে। এখন শুনছি, এমন কিছু ঘটেনি। প্রকৃত ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছি আমরা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষ হওয়ার পরে বলা যাবে।’

এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফেরি ডুবে যাওয়ার আসল কারণ তদন্ত করে জানাবে কমিটি।’

একই ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সানজিদা জেসমীনকে প্রধান করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। 

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফেরিডুবির কারণ সম্পর্কে জেলা প্রশাসক রেহেনা আকতার বলেন, ‘কী কারণে ফেরিটি ডুবেছে, তা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন