মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫

২ পৌষ ১৪৩২

leading admission leading admission
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫
২ পৌষ ১৪৩২
সরকারি রেজিস্ট্রেশন নম্বর- ১৮২
আপনি পড়ছেন : মতামত

বনসাই ও অপরিপক্ব জামায়াতে ইসলামী


রাজু আলাউদ্দিন
2025-08-13
বনসাই ও অপরিপক্ব জামায়াতে ইসলামী

জামায়াতে ইসলামী মনে করে এই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, পতাকা ও সংগীতের পরিবর্তন করলেই ক্ষমতায় আসতে পারবে। তাদের এমনটা মনে করার প্রধান কারণ বোধহয় এই যে মানুষ এখন অনেক বেশি আওয়ামীবিরোধী। আগেও যে তারা এমনটা মনে করতো না, তা নয়। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগকে হটিয়ে তারা এই মনে করাটাকে আরও বেশি নিশ্চিত ধরে নিচ্ছে।  

মানুষ অনেক বেশি আওয়ামীবিরোধী হয়েছে– তাদের এই অনুমান ঠিকই আছে। সেটা এই জন্যে নয় যে মানুষ জামায়াতে ইসলামীর আদর্শকে ভালোবাসতে শুরু করেছে। মূলত আওয়ামী লীগের মূঢ়তা, অত্যধিক দম্ভ ও স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের কারণেই মানুষ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা মানেই আওয়ামী লীগ ধরে নিয়ে জামায়াতে ইসলামী যে-হিসাবটা করছে সেটা ভুল। এই দেশের সব মানুষও যদি কোনোদিন আওয়ামীবিরোধী হয়ে যায়, তারপরও এই দেশের জামায়াত-সমর্থক ছাড়া একটি মানুষও স্বাধীনতাবিরোধী কখনোই হবে না। জামায়াতে ইসলামী এটা যতদিন না বুঝবে ততদিন পর্যন্ত তারা এই দেশের বৃহত্তর মানুষের সমর্থন পাবে না। তাদের পরাজয়ের গ্লানির কারণে তারা এই দেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে চায় না, অথচ তাদের পরাজয়ের ফলে জন্ম নেওয়া এই দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে তাদের আপত্তি নেই। তাদের এই স্ববিরোধী আচরণের মীমাংসা যতদিন না হবে ততদিন তারা এই দেশের মানুষের কাছে মোনাফেক হিসেবেই থেকে যাবে।

জামায়াতে ইসলামী মনে করছে এই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলমান এবং ধার্মিক, কিন্তু স্বাধীনতার প্রশ্নে সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগার না হলেও তারা কোনোভাবেই স্বাধীনতা বিরোধীদের বরদাস্ত করবে না। তার জলজ্যান্ত প্রমাণ তারা ভোটের মাধ্যমেই দিয়ে আসছে দশকের পর দশক। জামায়াতে ইসলামী ৩০০ আসনের মধ্যে ১০টি আসনও পায় না। তারা এই দেশের রাজনীতিতে প্রভাবক শক্তি বটে, কিন্তু তারা কখনোই বিজয়ী এবং শাসক হবে না, কারণ জনগণ তাদের কখনও বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস না করার কারণ তারা যে রাজনৈতিক আদর্শের কথা বলে, তার ঠিক বিপরীত না হলেও ভিন্ন আদর্শের রাজনৈতিক দলের সাথে জোট বাঁধে—ইসলামপন্থি হয়ে এই মোনাফেকি মানুষ কখনোই ভালো চোখে দেখে না। এর ফলে তারা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জনে ব্যর্থ।

এছাড়া, নারীদের প্রতি তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটিও তাদের কখনোই ক্ষমতায় যেতে দেবে না। ভুলে গেলে চলবে না যে এই দেশের সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র্যের কারণেই বাংলাদেশের নারীদের কখনোই মৌলবাদী ও ধর্মান্ধ করা যাবে না, যেটা আফগানিস্তানে সহজেই করা সম্ভব হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী যতদিন পর্যন্ত বাঙালি সংস্কৃতিকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত এই দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর ভোট তারা পাবে না। বাংলাদেশের মানুষকে যত মুসলমান ও ধার্মিক বলে মনে হোক না কেন, সে তার সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে জামায়াতি হতে নারাজ। যদি হতো তাহলে বহু আগেই জামায়াতে ইসলামী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে বিজয়ী হয়ে একক দল হিসেবেই সরকার গঠন করতে পারতো। স্বাধীনতার আগে এবং স্বাধীনতার পরেও জামায়াতে ইসলামী দলটি এত বছর পার করলো, অথচ এই দেশের জনমনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতিকে বুঝবার ক্ষেত্রে তারা এখনও নির্বোধ রয়ে গেছে। জনগণকে দলে ভিড়ানোর ব্যাপারে ধর্মকেই তারা একমাত্র নিয়ামক হিসেবে ভেবে যে ভুল করছে তা এখন তাদের কাছে নেশার মতো হয়ে গেছে। এই নেশা থেকে তারা কখনোই বেরুতে পারবে বলে মনে হয় না।

তারা উৎপাত করতে পারবে, মানুষকে ভয় দেখাতে পারবে ধর্ম ও পেশিশক্তির বলে, কিন্তু মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারবে না। সারা দেশে থেকে তাদের অনুসারীদের সমাবেশে জড়ো করতে পারবে, কিন্তু মানুষ তাদের উগ্র ও হিংস্র ছাড়া আর কিছুই ভাববে না। তাদের এই ভাবমূর্তি সাধারণ নাগরিকের জন্য ভীতির, নারীর জন্য আরও বেশি। ফলে সাধারণ মানুষের সমর্থন ও ভোট থেকে তারা যোজন যোজন দূরেই থেকে যায়।

জামায়াতে ইসলামীর বয়স বেড়েছে কিন্তু দেহে ও মনে তার বৃদ্ধি ঘটেনি। সে বয়োবৃদ্ধ এক বনসাই। এই দেশের কতিপয় মানুষের কাছে সে একটা দর্শনীয় বস্তু হয়ে থাকবে কিছু দিন। গুন্টার গ্রাসের টিন ড্রাম উপন্যাসের বালক অস্কারের মতো ছোট্টটিই থেকে যাবে; যা এতদিনেও বাড়েনি, তা আর কখনোই বাড়বে না। জামায়াতে ইসলামী বৃহত্তর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে যতদিন বুঝতে না পারবে ততদিন তারা বামনই থেকে থাকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আদর্শের পরিবর্তন না করলে, নারীকে ‘দাসী’ না ভেবে পূর্ণ মর্যাদায় গ্রহণ না করলে জামায়াতে ইসলামী কখনোই ক্ষমতায় আসতে পারবে বলে মনে হয় না। এই যে শত সহস্র ওয়াজে নারীবিদ্বেষী ও নারীর আবমাননাকারী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই এদের বিরুদ্ধে একটি শব্দও উচ্চারণ করেনি। তার মানে এসবে তাদের সমর্থন যদি নাও থাকে, অন্তত আপত্তি নেই। থাকলে এসব তারা বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতো। তারা তা নেয়নি। তারা তাদের রাজনৈতিক আদর্শও খুব একটা পরিষ্কার করে কিছু বলে কি?

তারা বড় জোর আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ক্ষমতার খুদকুঁড়া খেয়ে বেঁচে থাকবে আরও কিছু দিন। এই কারণে ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগ যদি এই দেশে প্রত্যাবর্তন করে তবে সেটা জামায়াতের কারণেই করবে। তারা যত বেশি ৭১-এর বিরোধিতা করবে, বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধিতা করবে, আওয়ামী এই অজুহাতকে পুঁজি করে নিজেদের তত বেশি শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে। ঠিক এই অর্থে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনে জামায়াতে ইসলামীই অনুঘটক হিসেবে –সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে— ভূমিকা পালন করবে। কথাটা কূটাভাসের মতো শোনালেও সত্য হলো এই যে আওয়ামী লীগকে জামায়াতের প্রয়োজন হবে তার বনসাই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সহযোগী শক্তি হিসেবে। জামায়াতের জ্বালানিই (জ্বলুনিও বলতে পারেন) আওয়ামী লীগের চালিকাশক্তি হয়ে ‍উঠবে তাদের ভুল পদক্ষেপ, কর্মকাণ্ড ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে।

লেখক: কবি ও অনুবাদক