শনিবার, জুন ১৫, ২০২৪

১ আষাঢ় ১৪৩১

শনিবার, জুন ১৫, ২০২৪
১ আষাঢ় ১৪৩১
সরকারি রেজিস্ট্রেশন নম্বর- ১৮২
আপনি পড়ছেন : প্রেস বিজ্ঞপ্তি

বাংলাদেশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেপথ্য কাহিনী (শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখন কোথায়)


স্টাফ রিপোর্টারঃ ই-সময়(কবীর নয়ন)
2021-11-18
বাংলাদেশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেপথ্য কাহিনী  (শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখন কোথায়)

 

 

১৯৭৫ সালের হিন্দি ব্লকবাস্টার মুভি শোলে  একটি হিন্দি-ভাষী অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার মুভি, যা পরিচালনা করেছিলেন রমেশ সিপ্পী এবং প্রযোজনা করেছিলেন তার বাবা জি. পি. সিপ্পী। অভিনয়ে ছিলেন ধর্মেন্দ্র ও অমিতাভ বচ্চন, আমজাদ খান আরো অনেকেই।

মুভির গল্পা অনুসারে, দুইজন জেলের সাধারণ অপরাধী বীরু ও জয়কে প্রাক্তন পুলিশ অফিসার নিযুক্ত করেন নিষ্ঠুর মনুষত্বহীন ডাকাত গব্বর সিংকে ধরবার জন্যে।  এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও গাব্বার সিংকে  ধরার জন্য পুরুস্কার ঘোষণা করা হয়। সিনেমাটিতে ঐ গাব্বার সিং এর একটা ডায়ালগ বেশ জনপ্রিয়তা পায়, বেটা শো যা ন্যাহি তো গাব্বার আ যা য়ে গা! মানে হল........  বাবু ঘুমিয়ে পর নয়ত গাব্বার চলে আসবে। 

যাইহোক, বাস্তব জীবনে গাব্বার না আসলেও দুই দশক আগে বাংলাদেশে গাব্বার সিং এর চেয়েও নিষ্ঠুর মনুষ্যত্বহীন মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল। যাদের  ভয় দেখিয়ে, নাম শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো লাগতনা তাদের ভয়ে বাচ্চাদের সাথে বড়রাও ঘুম যেতো। আসলে ঘুমিয়ে যেত বললে ভুল হবে, এদের ভয়ে ঘুমিয়ে যাওয়ার স্থানটুকু গড়ে তুলতে পারতনা ঠিকমত, গড়তে পারতনা মাথা গজার ঠাঁই। প্রকাশ্য দিবালোকে খুন,  চাঁদাবাজি, লুটতরাজ, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, ধর্ষণ, এমন কিছু নেই যাদের দ্বারা সম্পৃক্ত হয়নি। এ যেন বর্তমান তামিল সিনেমার দৃশ্যকেও হাড় মানিয়েছে। এসব মনুষ্যত্বহীন মানুষগুলোর অত্যাচারে যখন দেশের সাধারণ মানুষ অতীষ্ঠ ঠিক ঐসময়ের বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে ২৩ জনের একটা তালিকা করে নাম প্রকাশ করেন এবং এই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের সাথে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। এদের মধ্যে কারো কারো জন্য পঞ্চাশ হাজার আবার,  কারো কারো জন্য এক লাখ টাকা ধার্য করেন, যাদের ধরতে বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো তৎপর। তবে এদের অনেকেই এখন সাজা ভোগ করছে আবার কেউ কেউ আছেন পলাতক! 

শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিবুর রহমান তাজ একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি।  তার বিরুদ্ধে ২০০৪, ২০০৬, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে মিরপুর, কাফরুল ও পল্লবী থানায় দায়ের হওয়া ৯টি মামলা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, দায়রা জজ আদালত, জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী দমন ট্রাইব্যুনাল, অতিরিক্ত চিপ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। বাকি আর যত কারাগারে থাকা  শীর্ষ সন্ত্রাসীর আর  কোনও মামলায় সাজা হয়নি।  সব মামলাই আছে এদের বিচারাধীন। 

শীর্ষ সন্ত্রাসী আক্তার: - আক্তারের  বিরুদ্ধে ৯৮ ও ৯৯ সালে গুলশান থানায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলা দ্রুত বিচার আদালত ও অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।

 সানজিদুল হাসান ইমন: -ইমনের বিরুদ্ধে ১৯৯৭ ও ২০০৬ সালে তেজগাঁও এবং শাহবাগ থানায় দায়ের হওয়া দু’টি মামলা ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী বিপ্লব( লম্বু সেলিম)  লম্বু সেলিমের বিরুদ্ধে ৯৮, ৯৯ ও ২০১৭ সালে গুলশান ও শ্যামপুর থানায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন। 

শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহজাদা আছে: -শাহাজাদা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে একজন যার বিরুদ্ধে ২০০৪, ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে রামপুরা, খিলগাঁও, বাড্ডা ও রামপুরা থানায় দায়ের হওয়া ছয়টি মামলা ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী মাকসেদ আলী মুকসা । তার বিরুদ্ধে ১৯৯৫, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০১ ও ২০০৩ সালে ডেমরা ও সুত্রাপুর থানায় দায়ের হওয়া আটটি মামলা ঢাকার বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস: কিলার আব্বাস একটা আতঙ্কের নাম ,  তার বিরুদ্ধে ১৯৯৯, ২০০১ ও ২০০২ সালে কাফরুল, ক্যান্টনমেন্ট, উত্তরা ও কাফরুল থানায় দায়ের হওয়া পাঁচটি মামলা বিচারাধীন ঢাকার বিভিন্ন আদালতে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল( পিচ্ছি হেলাল): - কুখ্যাত খুনি পিচ্চি হেলাল যার বিরুদ্ধে ১৯৯৭, ২০০০ ও ২০০৪ সালে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের হওয়া তিনটি মামলা বিচারাধীন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন  ১৯৮৬, ১৯৯৫, ১৯৯৯ ও ২০০২ সালে যশোরের কতোয়ালী, ঢাকার কাফরুল ও ধানমন্ডি থানায় দায়ের হওয়া চারটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ আসলাম ( সুইডেন আসলাম): - তার বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সালে তেজগাঁও থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলা ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। 

 শীর্ষ সন্ত্রাসী খোরশেদ আলম রাসু: -যাকে অনেকে রুস নামে চিনে থাকে, ১৯৯৩ সালে রমনা থানায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলা বিচারাধীন আছে ঢাকার বিশেষ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী এস এম আরমান: - ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে তেজগাঁও এবং মতিঝিল থানায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দু’টি মামলা বিচারাধীন আছে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ আদালতে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী সোহেল রানা চৌধুরী ( ফ্রিডম সোহেল) ১৯৮৯ সালে ধানমন্ডি থানায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দু’টি মামলা বিচারাধীন।        


২০০১ সালে সরকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করার পরপর অনেকেই বিভিন্ন দেশে যেয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয় অথবা পালিয়ে থাকে। আবার এদের মধ্যে কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়, দু'একজন নিহত হয় পাবলিকের গণপিটুনিতে। তবে শুনতে পাওয়া যায়, যারা দেশ ত্যাগ করেছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার প্রশাসনের চোঁখ ফাকি দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ বিভিন্ন ছদ্মবেশে দেশ থেকে এসে ঘুরে যায়। এব্যাপরে জানতেন চাইলে, ঢাকা মহানগর পুলিশের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যাপারেই পুলিশের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোও  আদালতে বিচারাধীন প্রক্রিয়ায় রয়েছে । এছাড়া যারা দেশের বাহিরে রয়েছে তাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ইন্টারপোলের সাহায্য নেয়া হচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে যদি কোন   তথ্য আসে ইন্টারপোলের কাছে তাহলে সাথে সাথে তারা রাষ্টকে জানিয়ে দেয় এবং ইন্টারপোলের সাহায্য নিয় দুই একজনকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারাধীন কার্যক্রম চলমান প্রক্রিয়াধীন। তবে মামলার সাক্ষীদের বিলম্বের কারণে চলমান মামলার বিচার কার্যে বিলম্ব হচ্ছে, অাবার অনেকেই প্রথমে সাক্ষী দিতে চাইলেও এখন আর সাক্ষী দিতে চাচ্ছেনা। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গ্রেফতার হয়েছে তারা দেশের বিভিন্ন কারাগারের সেলে বন্দি আছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই রয়েছে কাশিমপুর কারাগারে। 


 ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন পিচ্ছি হান্নান, বিভিন্ন মাদক ব্যাবসার সাথে জড়িত ছিলো, র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হয় এবং আর এক শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং পিচ্চি হান্নানের সহযোগী  আলা উদ্দিন হাতিরঝিল এলাকায় জনসাধারণের গণপিটুনিতে নিহত হয়।

শীর্ষ সন্তানদের মধ্যে সবার শীর্ষে যার নাম, "কালা জাহাঙ্গীর" প্রকাশ্য দিবালোকে বেশক’টি হত্যাকাণ্ডের আসামি, যার হাত ধরে বেশ কিছু অত্যাধুনিক  অস্ত্র দেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ গোয়েন্দা এবং র‌্যাবের তৎপরতায় বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার হয়, তার ভেতরে রকেট লাঞ্চার এবং এ কে ৪৭ ও ছিল। বর্তমানে কালা জাহাঙ্গীর সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নেই। তবে ধারনা করা হয় দলিও ক্রোন্দলের কারণে কালা জাহাঙ্গীরকে হত্যা করা হয়, তবে বর্তমানে তার কোন সন্ধান নেই। 

প্রথমসারির ২৩ শীর্ষ সন্তানদের মধ্যে আরো যারা রয়েছে তাদের মধ্যে দুই ভাই (বিকাশ-প্রকাশ), যাদের কথা তুলে না ধরলেই নয়, যদি-ও কালা জাহাঙ্গীর খুবই অল্প সময় অপরাধ জগৎ এর লাইম লাইটে চলে এসেছে কিন্তু বিকাশ প্রকাশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের পদাচরণ আরো ভয়ংকর।  শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় বিকাশ প্রকাশের নাম ৪, ৫ নাম্বারের কিন্তু তাদের দৌঁড়ত্ব এখনো বাংলাদেশে চলমান। 

১৯৮৫ সালে এশিয়া সিনেমা হলের টিকিট কালোবাজারির প্রধান রমজানকে হত্যা করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিকাশের পথ চলা শুরু,  এরপর পিডব্লিউডির টেন্ডার নিয়ে জোড়া খুন করে বিকাশ প্রকাশের বাংলাদেশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিচরণ হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। । বিকাশ
 কয়েকবার গ্রেফতার হয় এরপর ২০১৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর জামিনে মুক্তি পেয়ে  বিভিন্ন পথ হয়ে পারি জমায় ইউরোপে। বিকাশের ছোট ভাই প্রকাশ অনেক আগেই পারি জমায় ইউরোপের দিকে কিন্তু বর্তমানেও বাংলাদেশ থেকে তাদের নামে কোটি কোটি টাকার চাঁদা আদায় হয় যা দিয়ে তাদের ইউরোপে চলে আলিশান জীবন যাপন। 

আন্ডারওয়ার্ল্ডের মোস্ট ওয়ান্টেড’ ক্রিমিনাল বিকাশ প্রকাশের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান বাংলাদেশের  হলেও বর্তমানে বিকাশ প্রকাশের ব্যাপারে কোন তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দাদের কাছে।  

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী  জানায় , পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে। তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ধরিয়ে দেওয়ার পুরস্কারও এছাড়া ইন্টারপোল অনুসন্ধান এখনো চলছে, কোন তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে  তারা  জিনিয়ে থাকে যা তথ্য নিরাপত্তার খাতিরে প্রকাশ করা হয়না ।

২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশ করার আগে আরো বেশ কয়েকজনের নামের তালিকা প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের মধ্যে লিয়াকত, হান্না, সুইডেন আসলাম, হারিস আহমেদ হারেস প্রমুখ। 

এছাড়াও,  শাহাদাত হোসেন, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয়, নবী হোসেন, রফিকুল ইসলাম, ইমাম হোসেন,আব্দুল জব্বার মুন্না, শামীম আহমেদ(আগা শামীম) জাফর আহমেদ মানিক ( মাইনক) , আমিন রসুল সাগর(টোকাই সাগর) , জিসান, লেদার লিটন, কামরুজ্জামান এবং ওমর ফারুক কচি বর্তমানে পালিয়ে আছেন।

ইন্টারপোলের রেড নোটিশে যাদের নাম দেয়া আছে তাদের মধ্যে, রফিকুল ইসলাম, হারিস আহমেদ, নবী হোসেন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, জাফর আহমেদ মানিক, জিসান, টোকাই সাগর, আবদুল জব্বার মুন্না ও শাহাদাত হোসেনসহ । তবে এরা সবাই পলাতক এবং এদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়নি।