এবার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ ফ্রান্স। এর আগে রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল। এছাড়া ফিলিস্তিনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে আন্দোরা, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা এবং মনাকো। এ নিয়ে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৫৬টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিল, যা মোট সদস্য রাষ্ট্রের প্রায় ৮০ শতাংশ।
এই স্বীকৃতির ফলে ফিলিস্তিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে তার মর্যাদা আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠল। ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে যে শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার ভিত্তি ছিল এই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। যদিও ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্রদের অনাগ্রহের কারণে এ উদ্যোগ কখনো আলোর মুখ দেখেনি।
২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে ‘সদস্যবহির্ভূত পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনের প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপন করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দেয়। ফলে ফিলিস্তিন এখনও জাতিসংঘে পূর্ণ সদস্যপদ পায়নি।
কারা স্বীকৃতি দিয়েছে
আলজেরিয়া প্রথম দেশ হিসেবে ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। এর কয়েক মিনিট আগে ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগঠনের (পিএলও) প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের একতরফা ঘোষণা করেছিলেন।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ও মাসে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১০ সালের শেষভাগ ও ২০১১ সালের প্রথমভাগে আরেক দফা স্বীকৃতি আসে।
তবে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের ফলে পশ্চিমা গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। এর মধ্যে ২০২৪ সালে স্বীকৃতি দেয় আর্মেনিয়া, স্লোভেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন, বাহামা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, জ্যামাইকা ও বার্বাডোজ।
কারা স্বীকৃতি দেয়নি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেন। ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা তাই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এছাড়া এশিয়ায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়নি।
আফ্রিকায় ক্যামেরুন, লাতিন আমেরিকায় পানামা এবং ওশেনিয়ার বেশিরভাগ দেশও স্বীকৃতি দেয়নি।
ইউরোপ এ বিষয়ে সবচেয়ে বিভক্ত মহাদেশ, যেখানে প্রায় অর্ধেক দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং অর্ধেক দেয়নি।
২০১০ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তুরস্ক বাদে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলো মূলত সাবেক সোভিয়েত ব্লকের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন কিছু সাবেক পূর্ব ব্লকের দেশ, যেমন হাঙ্গেরি এবং চেক প্রজাতন্ত্র, দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়নি।
পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপ এতদিন পর্যন্ত স্বীকৃতি না দেওয়ার ক্ষেত্রে একত্র ছিল। শুধু সুইডেন ব্যতিক্রম, যারা ২০১৪ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু গাজার যুদ্ধ পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। ২০২৪ ও ২৫ সালে সবচেয়ে বেশি পশ্চিমা দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ইতালি ও জার্মানি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে না। তবে স্বীকৃতির জন্য ওইসব দেশে বিক্ষোভ-আন্দোলন চলছে।
কেন স্বীকৃতি দিয়েছে
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে বহুপ্রতীক্ষিত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার আশা করছে পশ্চিমা দেশগুলো।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য পদক্ষেপ।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হলো একটি সত্যিকারের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে দাঁড়ানো, যা হামাসের ঘৃণামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, এটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও হামাসের অবসান চাওয়া মানুষদের ক্ষমতায়ন করবে এবং এটি কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়ার সমান নয়।
এছাড়া গাজায় মানবিক সংকট মোকাবিলা করাও পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতির একটি প্রধান কারণ। এ বিষয়ে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ‘শান্তির সময় এসেছে’ এবং ‘গাজায় চলমান যুদ্ধকে কিছুই ন্যায্যতা দেয় না।’
স্বীকৃতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের মিত্রদের দেওয়া এই স্বীকৃতি বাস্তবে বড় কোনো পরিবর্তন না আনলেও তা ফিলিস্তিনিদের প্রতি একটি শক্তিশালী নৈতিক বার্তা।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক আইনের সবচেয়ে জটিল প্রশ্নগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন দক্ষিণ ফ্রান্সের এক্স-মার্সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক রোমেন ল্য বোফ।
তিনি বলেন, স্বীকৃতি সম্পূর্ণ আইনি বিষয় নয়, আবার পুরোপুরি রাজনৈতিক বিষয়ও নয়। বরং এটা দুইয়ের মাঝামাঝি এক ধরনের মিশ্র অবস্থা।
তিনি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, রাষ্ট্রগুলো স্বীকৃতির সময় ও ধরন বেছে নিতে স্বাধীন এবং এ ক্ষেত্রে প্রচুর ভিন্নতা রয়েছে—যা কখনও প্রকাশ্য কখনও অপ্রকাশ্য।
ল্য বোফের মতে, স্বীকৃতিগুলো নথিভুক্ত করার কোনও দপ্তর নেই। তিনি বলেন, স্বীকৃতি হলো রাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত, যার ওপর অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাধ্যবাধকতা নেই। এটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ও ইচ্ছার ওপর। তাই অনেক সময় স্বীকৃতি দেওয়া বা না দেওয়ার মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়।
তার মতে, স্বীকৃতি মানে এই নয় যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেছে। আবার স্বীকৃতি না দেওয়া মানে-এই নয় যে, ফিলিস্তিন কোনও রাষ্ট্র নয়। যদিও স্বীকৃতির প্রভাব মূলত প্রতীকী ও রাজনৈতিক। তবুও বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশ দেশ বলছে- ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হওয়ার জন্য সব প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেছে’।
আইনজীবী ও ফ্রাঙ্কো-ব্রিটিশ আইন অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস ২০২৫ সালের আগস্টের মাঝামাঝি নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছিলেন, আমি জানি,অনেক মানুষের কাছে এটি কেবল প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে প্রতীকীর গুরুত্বও অনেক। এটি এক ধরনের খেলার মোড় ঘোরানো। কারণ একবার যখন আপনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন… তখন কার্যত আপনি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সমান অবস্থানে নিয়ে আসেন।
এদিকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতির জবাবে পশ্চিম তীরের কিছু অংশ ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। লক্ষ্য, ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সৃষ্টির সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দেওয়া। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ব্রিটেন বা অন্য দেশগুলোর আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার দিন শেষ হয়ে গেছে।’
সূত্র: সিএনএন, আল জাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল, অ্যাক্সিওস